আজ বুধবার | ২৬ জুন, ২০১৯ ইং
| ১২ আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২২ শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী | সময় : সন্ধ্যা ৬:৩৫

মেনু

বাঙ্গালীর ইতিহাস ঐতিহ্যের খেজুরের রস ধরে না রাখলে, আগামী প্রজন্মকে খেজুর রসের কিচ্ছা বলে ঘুম পাড়াতে হবে!

বাঙ্গালীর ইতিহাস ঐতিহ্যের খেজুরের রস ধরে না রাখলে, আগামী প্রজন্মকে খেজুর রসের কিচ্ছা বলে ঘুম পাড়াতে হবে!

॥ শহীদুল ইসলাম পাইলট ॥
সোমবার, ০১ জানুয়ারি ২০১৮
২:২০ অপরাহ্ণ
79 বার

বাঙ্গালীর ইতিহাস ঐতিহ্যের সঙ্গে খেজুরের রসের একটা সম্পর্ক রয়েছে। এ সম্পর্ক অত্যন্ত নিবীর। এ সম্পর্ককে আমরা ভুলতে বসেছি। এখন আর খেজুরের রসের সে ইতিহাস ঐতিহ্য নেই। খেজুরের রসও তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। বিলুপ্তির পথে খেজুর গাছ। এখন আর গ্রাম বাংলার পথে-ঘাটে খেজুর গাছের সাড়ি চোখে পড়েনা। খুব বেশীদিন আগের কথা নয়। আমাদের ছেলে বেলায় দেখেছি খেজুর গাছ, খেজুরের রস, খেজুরের গুড় ছিল গ্রাম বাংলার ঘরে-ঘরে, পথে ঘাটে। তখন খেজুর গাছ ছিলনা এমন রাস্তা-ঘাট বাড়ি-ঘর কমই ছিল। যা আজ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। অবস্থা যে পর্যায়ে পৌঁচেছে এতে করে অচিরেই বাংলার জমিন থেকে হারিয়ে যাবে খেজুর গাছ, খেজুরের রস ও খেজুরের গুড়। আমাদের ছেলে বেলায় শীতের আগমনের সাথে সাথে খেজুর গাছ থেকে খেজুরের রস সংগ্রহের ধুম পড়ে যেত। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকতাম খেজুরের রসের স্বাদ গ্রহন করার জন্য। শীতের শুরুতেই খেজুরের রস সংগ্রহের কাজে পারদর্শী আঞ্চলিক ভাবে যাদের শিউলী বলে ডাকা হয় তারা ছেন দা, কোপা দা, ঠুসি নামীয় বিশেষ ঝুড়ি, কাছি প্রস্তÍÍত করতে শুরু করতো খেজুরের রস সংগ্রহ করার কাজে। তারা উল্লেখিত উপকরণ নিয়ে খেজুরগাছে চড়ে বিশেষ ভাবে খেজুর গাছের সাথে নীজ কোমরে কাছি দিয়ে বেঁধে খেজুর গাছে বিশেষ খাজ কেঁটে তাতে পায়ের পাতা ধরে রেখে বিশেষ ভঙ্গিমায় খেজুর গাছের কান্ডের চার পাশের কিছুডাল আঞ্চলিক ভাবে বারগুয়া বলে তা ফেলে নরম অংশ নিপুন ভাবে ছেটে ছুলে চলে আসতেন। এ ভাবে কিছুদিন অতিবাহিত হবার পর তারা পুনরায় একই কায়দায় খেজুর গাছে চড়ে পূর্বের চাঁছা ছোলা অংশের দু পাশে ধারালো ছেন দা দিয়ে দাগ কেঁটে দাগের নিচের অংশ একই বিন্দুতে যোগ করে বিন্দুর মাঝ খানে নালা কেঁটে তাতে বাশের কঞ্চির থেকে তৈরী করা বিশেষ ধরণের নালি লাগিয়ে তার দু পাশে হাড়ি সেট করার বাশের কঞ্চির সেট খুটি স্থাপন করে রসের হাড়ি লাগিয়ে চলে আসতো। এভাবে লাগানো হাড়িতে সারারাত গাছেই লটকানো থাকতো। আর নালি দিয়ে ফোটা ফোটা রস পড়ে পুড়ো হাড়ি ভরে থাকতো। খুব সকালে ওঠে তা নামিয়ে আনতো শিউলিরা। তা ছড়িয়ে পড়তো হাটে-বাজারে, রাস্তা-ঘাটে। এবাড়ি ওবাড়িতে। তা দিয়ে তৈরী হত ঝোলা গুড় মুছি গুড় পাটালীগুড় ইত্যাদি নামীয় নানা ধরনের গুড়, নাস্তা, পায়েশ, মিস্টান্ন নানান জাতের পিঠা সহ রকমারী মিষ্টি জাতীয় খাবার। সে সময় খেজুরের রস, খেজুরের গুড় না হলে কারো খাওয়াই পূর্ণ হতো না। খেজুর গাছ ও খেজুরের রসকে ঘিরে গ্রামের মানুষ ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করতো। উপার্জন করতো। এর উপর নির্ভর করে ব্যবসা বানিজ্যও হয়েছে প্রচুর। যারা গুড় তৈরী করতো তারা সকালে নানা ভাবে খেজুরের রস সংগ্রহ করে বিশেষ ভাবে তৈরী করা চুলার উপর তাফাল নামীয় বিশেষ পাত্র স্থ্াপন করে আগুনে দিয়ে গুড় তৈরী করতো। এ গুড় আবার নানা ধারণের হতো। নরম তরল জাতীয় এক ধরনের গুড়, যাকে বলা হতো ঝোলা গুড়। মাটিতে গর্ত করে তার উপর কাপড় বিছিয়ে গর্তে ঝোলাগুর ঢেলে শুকিয়ে তৈরী করা হতো মুছিগুড়। বড় কোন পাত্রে কিংবা বিছানার উপর ঝোলাগুড় ঢেলে শুকিয়ে তৈরী করা হতো পাটালীগুড়। এ সব গুড়ের স্বাদ ছিল আলাদা-আলাদা। মূল্যও ছিল আলাদা-আলাদা। এ সব গুড় ধামা ভরে নিয়ে যাওয়া হতো গ্রাম-গঞ্জের হাট বাজারে। প্রতিটি হাটে গুড় পট্টি কিংবা গুড়হাটা ছিল। গুড় পট্টিতে আড়তদার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পাইকার, সরবরাহকারী খুচরা বিক্রেতা সহ সব ধরণের ব্যবসায়ীদের পদচারনা থাকতো। গ্রামের বিভিন্ন হাট বাজার থেকে এ সব গুড় চলে যেতো শহর বন্দরে। সেখান থেকে চলে যেত দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্থানে। এ সব গুড় তৈরী ও রস সংগ্রহের কাজে বাড়ির ঝি বউ, ছেলে মেয়েদেরও অংশ গ্রহন থাকতো। এর উপর ভিত্তি করে মৃৎ শিল্পের বিকাশ ও সম্পসারণও ছিল উল্লেখযোগ্য। রস সংগ্রহের হাড়ি, গুড় তৈরীর পাত্র, গুড় রাখার পাত্র ইত্যাদি তৈরী হতো মাটি দিয়ে। মাটির তৈরী পাত্রেই রস, গুড় সংরক্ষিত হতো। সে হিসেবে শীত মওসুম এলেই মৃৎ শিল্পীর কাজও ব্যবসার পরিধী বেড়ে যেত। বাড়ীর ঝি, বউ, ছেলে মেয়েরা রস সংগ্রেহের হাড়ি ধোয়া, হাড়ি শুকানো, চুনের আস্তর দেয়া, রসে তা দেয়া, গুড় প্রক্রিয়া ইত্যাদি কাজ করতো। সে সময় গ্রাম বাংলার ঘরে-ঘরে খেজুেরর রস ঘিরে আনন্দ উৎসবের বন্যা বয়ে যেতো। প্রতি ঘরে, প্রতি দিন খেজুরের রস ও খেজুরের গুড়ের রকমারী খাবারের পসরা সাজানো হতো। সে দিন এখন আর নেই। এখন খেজুরের রস অধরা হয়ে গেছে। খেজুরের গাছ হারিয়ে যাবার পেছনে খেজুর গাছের অপর্যাপ্ততা ও বিলুপ্তিই প্রধান কারণ, এখন আর কেউ খেজুর গাছ রোপন করতে চায় না। অন্যদিকে দেশে যত খেজুর গাছ ছিল তা এক শ্রেণীর অতি লোভী অসাধু ব্যবসায়ীদের কড়াল গ্রাসে পড়ে ইট ভাটায় উত্তপ্ত আগুনে পুড়ে ছাড়খার হয়ে গেছে। কয়লা দিয়ে ইট পোড়ানোর কথা বলে, ইট ভাটায় মালিকরা ভাটার অনুমোদন নিয়ে সস্তা ও সহজ লভ্য খেজুর গাছ দিয়ে ইট পোড়ানোর কাজ করার ফলে দেশের খেজুর গাছ হারিয়ে গেছে। এখনো অনেক ইট ভাটায় খেজুর গাছ জ্বলছে, যা দেখার কেউ নেই। কেউ যদি থাকতো তা হলে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য মন্ডিত খেজুর গাছ বিলুপ্তি হতো না । এটা জাতীয় সম্পদ, জাতীয় ঐতিহ্য। এর দিকে কেউ কোন দিন নজর দেয়নি। একে একে আমাদের চিরায়েত আবহমান বাংলার সকল ইতিহাস ঐতিহ্যই হারিয়ে যাচ্ছে। এটা রক্ষা করার সরকারী কোন উদ্যোগ নেই। যারা করবেন কিংবা রক্ষার দায়িত্ব যাদের তারা তা বিনষ্ট করছে। আমাদের লোভের কাছে , লালসার কাছে, খামখেয়ালীর কাছে, অনিয়ম দুর্নীতির কাছে সবই হেরে যাচ্ছে। আমাদের আগামী প্রজন্ম কে খেজুরের রস ও গুড়ের কিচ্ছা বলে ঘুম পাড়াতে হবে। তাদের খেজুরের রস, খেজুরের গুড়ের স্বাদ দেয়া আমাদের সম্ভব হবে না। কারণ এখন আমরাইতো খেজুরের রস ও খেজুরের গুড়ের আসল স্বাদ পাচ্ছিনা। সে আসল রস আসল গুড় কালের ¯্রােতে, মহা দুর্যোগে পড়ে হারিয়ে গেছে। এখন বাজারে কৃত্রিম খেজুরের রস পাওয়া যায়। পানির সাথে কেমিক্যাল মিশিয়ে সেকারিন ও চিনি দিয়ে খেজুরের রসের ফ্লেবার সংমিশ্রন করে তৈরী হচ্ছে খেজুরের রস। সে রস থেকে তৈরী হচ্ছে অন্যান্য সামগ্রী, যা অতি পরিতাপের বিষয়। অতি দুঃখজনক ভাবে বলতে হয়, আধুনিকতার নামে, ডিজিটালাইজডের নামে আমরা আমাদের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলছি। এ যেন নিজেকে অস্বীকার করারই নামান্তার। এটা এক ধরণের বোকামি ছাড়া আর কিছুই না। এটা আহাম্মকীও বটে। কোন আহম্মক ছাড়া তার নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, অস্তিত্ব অস্বীকার করতে পারে না, যা আমরা হরহামেশাই করে যাচ্ছি। এ জন্য দেশ, জাতি, রাষ্ট্র আমরা সকলে সম্মিলিত ভাবে দায়ী। আমরা মানষিক ভাবে সকালে আমেরিকায় নাস্তা করি, দুপুরে বৃটেনে লাঞ্চ করি, রাতে ফ্রান্স ডিনার করি। আসলে আমরা কী করি নিজেরাও জানিনা। কথা-বার্তায়, চলনে-বলনে আমরা পাশ্চাত্য ধারা অনুকরণ অনুস্মরণ করতে অভ্যস্থ। যা ইউরোপে আমেরিকা সহ প্রাশ্চাত্যের লোকেরা করেনা। তারা মরে গেলেও তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য, কৃষ্টি কালচার ছাড়েনা। তারা তাদের সংস্কৃতি কঠিন ভাবে ধারণ করছে আর আমরা আমাদের সংস্কৃতি সহজ ভাবে বর্জন করছি। আমরা মনে করি আমরা অত্যন্ত বুদ্ধিমান, স্মার্ট সচেতন শিক্ষিত, কিন্তু আসলে আমরা কতটুকু সচেতন কতটুকু শিক্ষিত, কতটুকু সভ্য তা আমাদের কার্যকলাপ খেয়াল করলেই যে কেউ বুঝতে পারবে। নিজেকে অস্বীকার করা, নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা নিজের সংস্কৃতি কে অস্বীকার করার মানে স্মার্টনেস বা আধুনিকতা নয়। বরং নিজেকে জানা, বুঝা, নিজের ইতিহাস ঐতিহ্য লালন করা, ধারণ করার নামই আধুনিকতা ও স্মার্টনেস। এর বাইরে কিছু হতে পারেনা। এর বাইরে ভাবতে গেলে, করতে গেলে, চলতে গেলে মুর্খতার কবলে পড়তে হবে। আমার মনে হয় আমরা সে মূখর্তার কবলে পড়ে গেছি। আজ আমাদের খেজুর গাছ নেই, তাল গাছ নেই, সুপারী গাছ নেই, আম গাছ নেই, জাম গাছ নেই, গাব গাছ নেই। এ সব উদ্ভীদ ছিল আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য মন্ডিত জাতীয় ও দেশীয় সম্পদ। এ সম্পদ রক্ষার জন্য আমাদের উদ্যোগ নেই। যা কিছু আছে তা কেবলই লোক দেখানো। দায়সাড়া গোছের। তা আবার অনিয়ম ও দুর্নীতির কবলে পতিত। আমরা আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য ভুলে, জাতীয় ও দেশীয় সংস্কৃতি ছেড়ে, সব কিছুতেই উলঙ্গ হয়ে পড়ছি আর ঘাটে ঘাটে মার খাচ্ছি। অখাদ্য কু-খাদ্য বিষ ভক্ষণ করছি আর হেসে হেসে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছি। আজ আমরা আপেল, আঙ্গুর, আনার, কমলা সঙ্গে বিদেশ থেকে আমদানি কৃত বিষ অনায়েসে খেয়ে যাচ্ছি। কেমিক্যাল খাচ্ছি, রং খাচ্ছি, আবর্জনা খাচ্ছি, ময়লা খাচ্ছি আর হাসছি। সে সাথে নিজেকে স্মার্ট, আধুনিক, রুচিশীল সভ্য ভাবছি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আমরা আসলে ক্রমন্বয়ে অপসংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। অপসংস্কৃতি কড়াল গ্রাসে আমরা নিপতিত। এ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে আমাদের সব অর্জন ব্যর্থ হবে। সময় থকতেই তাই সাবধান হতে হবে। নিজস্ব কৃষ্টি কালচারের প্রতি মনোনিবেশ করাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। জাতীয় সম্পদ, দেশীয় সম্পদ, নিজস্ব কৃষ্টি কালচার এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তার মর্যাদা প্রদান করতে হবে। তাকে লালন করতে হবে। তাকে ধারণ করতে হবে। বিলুপ্ত প্রায় সকল ইতিহাস ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের জরুরি কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই ফিরে পাবো আবহমান বাংলা। তাহলেই ফিরে আসবে হারানো দিন। আমরা আমাদের শৈশবে দেখা বাংলাদেশ চাই। আমরা চিরায়েত বাংলাদেশ চাই। আমরা দেশীয় সাংস্কৃতি চর্চা করতে চাই। আমরা দেশীয় সম্পদ রক্ষা করতে চাই। আমরা খেজুরের রস চাই, গুড় চাই। আমরা সুস্বাদু খেজুর চাই। কারণ খেজুর একটা সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল। আমরা তাল চাই, বেল চাই। আমরা দেশীয় ফল, দেশীয় ফুল, দেশীয় উদ্ভিদ, দেশীয় গুল্ম চাই। আমাদের চাওয়া, আমাদের দাবী বাস্তবায়নের মাধ্যমে সুজলা, সুফলা শষ্য শ্যামলা বাংলার রূপ ফুটে উঠবে।

লেখক: সাংবাদিক শহীদুল ইসলাম পাইলট, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক রুদ্রবার্তা, শরীয়তপুর। কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি, বাংলাদেশ মোফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ), ঢাকা।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন
Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on LinkedInPrint this page

মন্তব্য

comments