আজ বুধবার | ২৬ জুন, ২০১৯ ইং
| ১২ আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২২ শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী | সময় : সন্ধ্যা ৭:০৬

মেনু

মৃত্যুঞ্জয়ী জননেতা আব্দুর রাজ্জাক

মৃত্যুঞ্জয়ী জননেতা আব্দুর রাজ্জাক

রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭
১০:১১ পূর্বাহ্ণ
1230 বার

ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায় মা, বাবা, ভাই, বোন, বন্ধু, বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া- প্রতিবেশী সকলেই আছি এক সুতোহীন মায়ার বন্ধনে বাঁধা। কখন সে বন্ধন ছিন্ন হবে বুক পেতে নিতে হবে নিয়তির তীর, শোকের শরাধার থেকে ছুটে আসা সেই অব্যর্থ শর কখন কাকে বিদ্ধ করবে আমরা কেউ তা জানি না। এমনই একটা অব্যর্থ শর ২০১১ খ্রীঃ ২৩ ডিসেম্বর তারিখে বিদ্ধ করলো পদ্মা বিধৌত পল্লী মৃত্তিকায় বেড়ে ওঠা একজন কোমল প্রাণের মানুষকে, যাকে বিশেষণ দিয়ে বিশেষায়িত করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। যিনি স্বনামেই স্বনামধন্য, স্বগৌরবে গৌরবান্বিত, স্বমহিমায় মহিমান্বিত। যিনি আমাদের সবারই পরিচিত পরম শ্রদ্ধেয় আব্দুর রাজ্জাক ভাই। তাঁর শাহাদাৎ বার্ষিকীতে বিজয়ের মাসে আমি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনর্ম চিত্তে তাকে স্মরণ করছি।
রাজ্জাক ভাইকে আমরা সকলেই চিনি বাংলাদেশের অন্যতম জাতীয় নেতা, আওয়ামীলীগের অন্যতম নীতি নির্ধারক মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, জাতীয় বীর এবং একজন সৎ নির্ভীক রাজনীতিবিদ ও সফল মন্ত্রী হিসেবে তিনি সকলের কাছেই সুপরিচিত। তাঁর আরও একটা পরিচয় আছে, সেটা হয়তো বা আমরা অনেকেই জানি না। তিনি ছিলেন, স্বাধীন বাংলা বিপ্লøবী পরিষদ বা নিউক্লিয়াসের অন্যতম সংগঠক। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাকল্পে ১৯৬৪ সালের জুলাই মাসে তৎকালিন ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক এবং কাজী আরেফ আহমেদ গোপনে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ বা নিউক্লিয়াস গঠন করেন। মূলতঃ বিপ্লবী পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত হয় ১৯৬২ সালের ডিসেম্বর মাসে। প্রকাশ্যে এ সংগঠনের কোনো কার্যক্রম ছিলো না। কিন্তু শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ১১ দফা আন্দোলনে এ সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৬৪-১৯৬৮ সাল পর্যন্ত এ সংগঠন তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যায়ে ৩০০টি গোপন শাখা করতে সমর্থ হয়। প্রতিটি শাখা কমিটি ছিল ৫-৭ সদস্য বিশিষ্ট। সদস্যরা ছিলেন আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগের সৎ ও নির্ভিক কর্মী। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ হাজার। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সিরাজুল আলম খান এবং আব্দুর রাজ্জাক স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের উদ্দেশ্য, গঠন, কর্ম পদ্ধতি ও সাংগঠনিক বিস্তৃতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করেন এবং তখন থেকেই বঙ্গবন্ধু এ সংগঠনের প্রধান পৃষ্টপোষকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু ছাড়া ও যারা প্রত্যক্ষ পরোক্ষ সহায়তা করেন তারা হলেন, তাজউদ্দিন আহমেদ, এম এ আজিজ, এম এ হান্নান, সোহরাব হোসেন,ইউসুফ আলী, মোশারফ হোসেন প্রমূখ।
১৯৬৯ এর ২৫ মার্চ জেনারেল আইয়ূব খাঁ সামরিক আইন জারি করে জেনারেল ইয়াহিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২৬ মার্চ ইয়াহিয়া খা জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত বেতার ভাষণে সাধারণ নির্বাচন ও জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার প্রতিশ্রুতি দিলে পূর্ব বাংলার মানুষকে সংগঠিত করে ম্যান্ডেট আদায়ের জন্য আওয়ামীলীগের পাশা পাশি স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। পূর্ব বাংলার প্রতিটি মহকুমা ও জেলায় বিপ্লবী ফোরাম গঠন করা হয়। ১৯৭০ সালের নভেম্বরে সিরাজুল আলম খান ও আব্দুর রাজ্জাক স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের সাংগঠনিক বিস্তৃতি কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করেন। বঙ্গবন্ধু তখন স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের হাই কমান্ডে শেখ ফজলুল হক মনি এবং তোফায়েল আহমেদকে অন্তর্ভক্ত করতে বলেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে শেখ ফজলূল হক মনি ও তোফায়েল আহমেদকে ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি হাই কমান্ডে অন্তর্ভূক্ত করা হয়।

স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের সামরিক শাখা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স যা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিব বাহিনী নামে পরিচিত। বঙ্গবন্ধুর ন্যায় স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ স্বাধীনতার প্রশ্নে ছিল আপোষহীন। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের বিপ্লবী শাখা গঠনের উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সেকেন্ড ডিফেন্স হিসেবে কাজ করা এবং কোনো কারণে যদি মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় সে ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা যোদ্ধাদের সাথে একত্রিত হয়ে গেরিলাযুদ্ধকে বেগবান করা এ যে কোনো মূল্যে হানাদার পাকিস্তানী হায়ানাদের পরাস্ত করা। এ জন্য মুক্তিযুদ্ধকালিন বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স চারজন কমান্ডারের নেতৃত্বে চারটি সেক্টরে বিভক্ত ছিল। তাদের সহায়তা করেন চারজন সহকারি কমান্ডার। রাজশাহী বিভাগের প্রধান ছিলেন, সিরাজুল আলম খান এবং সহকারি প্রধান ছিলেন, মনিরুল ইসলাম, (মার্শাল মনি) খুলনা বিভাগের প্রধান ছিলেন, তোফায়েল আহমেদ, সহকারি প্রধান নূরে আলম জিকু, ঢাকা বিভাগের প্রধান ছিলেন, আব্দুর রাজ্জাক এবং সহকারী প্রধান সৈয়দ আহমেদ, চট্টগ্রাম বিভাগের প্রধান ছিলেন, শেখ ফজলুল হক মনি এবং সহকারী প্রধান ছিলেন, আ স ম আব্দুর রব, আর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ছিলেন, কাজী আরেফ আহমেদ।
১৯৬৭ সালে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বঙ্গবন্ধু আওয়ামীলীগের মিলিট্যান্ট পাওয়ার বেইজ হিসেবে আওয়ামীলীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেছিলেন রাজ্জাক ভাই ছিলেন সেই বাহিনীর ও প্রধান। এই বাহিনীর দায়িত্ব ছিল বঙ্গবন্ধুর সার্বিক নিরাপত্তা বিধান। ঝুঁকিপূর্ণ নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে বিভিন্ন সমাবেশে আনা নেয়ার কাজটি করতো এই বিশেষ বাহিনী। অগ্নিঝড়া ৭ মার্চে রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় বঙ্গবন্ধুকে নিরাপদে মঞ্চে নিয়ে আসা এবং ঐতিহাসিক ভাষণ শেষে যথাস্থানে গোপনে পৌছে দেয়ার দায়িত্বটি সুষ্ঠুভাবে পালন করেছিলেন তিনি। ছায়ার মতো সর্বদা হরিনের দৃষ্টিতে তাকিয়ে জীবন বাঁজি রেখে বঙ্গবন্ধুকে পাহাড়া দেয়ার দায়িত্বে ছিলেন বলেই আব্দুর রাজ্জককে বঙ্গবন্ধুর অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে তার পেছনে দাড়ানো দেখা যেতো।——-চলবে।

লেখক: যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আ: সামাদ তালুকদার, প্রধান সম্পাদক দৈনিক রুদ্রবার্তা, সাধারণ সম্পাদক শরীয়তপুর জেলা প্রেসক্লাব

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন
Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on LinkedInPrint this page

মন্তব্য

comments