আজ বুধবার | ২৬ জুন, ২০১৯ ইং
| ১২ আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ২২ শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী | সময় : সন্ধ্যা ৭:২০

মেনু

মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের সার্বিক সুবিধা প্রদান প্রসঙ্গে

মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের সার্বিক সুবিধা প্রদান প্রসঙ্গে

শহীদুল ইসলাম পাইলট
রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭
৯:১০ পূর্বাহ্ণ
1209 বার

গত ২৫ ডিসেম্বর স্বাধীনতার চেতনায় লালিত অরাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিদীপ্ত সংগঠন স্বাধীনতা সংসদের বিজয় দিবস সন্মাননা অনুষ্ঠানে সন্মাননা গ্রহনের জন্য অংশ গ্রহনের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। মঞ্চে বক্তৃতা দেবার জন্য নাম ঘোষণার পর কি বিষয়ে বলা যায় তা মুহূর্তের মধ্যেই ঠিক করে নিলাম। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী আলহাজ্ব এড্ভোকেট আ.ক.ম. মোজাম্মেল হক। যেহেতু বিজয়ের মাস, হাতের কাছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী, সংগঠনের নামও স্বাধীনতা সংসদ সেহেতু স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের এড়িয়ে আর কিছু বলার সুযোগ নাই। সুতরাং স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সংক্ষিপ্ত সময়ে কিছু কথা তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। বলার অনেক ছিল, সময় ছিল কম। তাই যা বলার ছিল তা বলা হয়নি। সে না বলা কথা পাঠকদের জন্য তুলে ধরতে চেষ্টা করছি। ঢাকাস্থ পাবলিক লাইব্রেরীর শওকত ওসমান মিলনায়তনে স্বাধীনতা সংসদ আয়োজিত ‘বিজয় দিবসের অঙ্গীকার, মধ্যম আয়ের দেশ গড়বো এবার’ শীর্ষক আলোচনা সভা, বিজয় দিবস সন্মাননা পুরস্কার-২০১৭ ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় আমি সেদিন সাহস করে বলতে পেরেছিলাম যে, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের চাকরীর ক্ষেত্রে কোন বয়সের সীমাবদ্ধতা থাকা উচিৎ নয়। মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রীর উপস্থিতিতে আমি যে দাবী উত্থাপন করেছি, আমার সে দাবীর সাথে দেশের সকল মুক্তিযোদ্ধারা আশা করি একমত হবেন। কারণ আমার কথার সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণের কথা ধ্বনিত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাগণ সর্বযুগের, সর্বকালের, সর্বশেষ্ঠ সন্তান। তারা জাতীর গর্ব। মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে বা এড়িয়ে স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশ কথা চিন্তা করা যায় না। তারা যদি সে দিন অস্ত্র হাতে তুলে না নিত, তারা যদি তাদের জীবন-যৌবন উৎসর্গ না করতো তবে আমরা বাংলাদেশ নামীয় একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্রের কথা চিন্তা করতে পারতাম কী-না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের অসামান্য অবদান ভোলার মত না। তারা জীবন বাজী রেখে একটি সংঘবদ্ধ, প্রশিক্ষিত, সুসজ্জিত আধুনিক সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বলতে গেলে খালি হাতে যে ভাবে লড়েছেন, যুদ্ধ করেছেন তা আবাক করার মত ঘটনা। এ বীর সন্তানদের আমাদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। এদের মূল্যায়ন করতে না পারলে আমাদের স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়বে।

স্বাধীতার ৪৬ বছর অতিবাহিত হবার পর ও আমরা আমাদের সূর্য্য সন্তান, মহান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারিনি। স্বাধীনতার পর কোন সরকারই মুক্তিযোদ্ধাদের কাথা ভাবেনি। ৯৬ সালে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা প্রদান প্রথা চালু করেছেন। বর্তমান তা অব্যাহত আছে। ভাতার পরিমানও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু ভাতা প্রদানই যথেষ্ট নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ সুবিধা প্রদান করা প্রয়োজন। মহান মুক্তিযুদ্ধের কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক কিছু ব্যাহত হয়েছে। অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। শহীদ পরিবারের সদস্যরা পরিবারের স্বক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে আজো মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এদের পরিবারের দিকে খেয়াল করতে হবে। শহীদ পরিবারের সন্তানদের কোন বাঁধা ও প্রক্রিয়া ছাড়া যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারী চাকরীতে নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। এতে করে শহীদ পরিবার গুলো স্বাবলম্বী হতে পারবে। যুদ্ধে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়েছেন। কেউ হাত হারিয়েছেন, কেউ পা হারিয়েছেন, কেউ শরীরের অন্য কোন অঙ্গ হারিয়েছেন। এ সব যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদেরও যোগ্যতা অনুযায়ী কোন বয়সের সীমা ও চাকরীর সীমা না রেখে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সরকারী চাকুরীতে নিয়োগ প্রদান ও নিয়োগ বহাল রাখতে পরলে তারা খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে পরবে। আর মুক্তিযোদ্ধা সন্তাদের চাকুরীর কোন বয়ষের সীমানা রাখা উচিৎ নয়। সকল বয়েসে, সকল মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের সন্তানগণ যাতে যোগ্যতা অনুযায়ী চাকুরীতে যোগদান করতে পারে সে ব্যবস্থা নেয়ার প্রয়োজন। কারণ দেশ থাকবে, জাতি থাকবে কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা থাকবে না। তারা যে ক’টা দিন আছে, যে ক’জন আছে তাদের স্বাচ্ছন্দে থাকা উচিৎ। তারা যাতে স্বাচ্ছন্দে থাকতে পারে সে ব্যবস্থা নেয়া আমাদের কর্তব্য। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যারা অস্বচ্ছল আছে তাদের স্বচ্ছলতা প্রদানের সার্বিক ব্যবস্থা করা দরকার। ভূমিহীন ও গৃহহীন মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমি প্রদান করে গৃহ নির্মানের ব্যবস্থা করা দরকার। সকল মুক্তিযোদ্ধাদের যানবাহরে ভাড়া মওকুফ করা উচিৎ যাতে তারা বিনা ভাড়ায় চলাচল করতে পারেন। চিকিৎসা ক্ষেত্রে তাদের সুবিধা প্রদান করা উচিৎ। মুক্তিযোদ্ধারা যাতে নিজের এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্য বিনা মূল্যে সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা পেতে পারে সে ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ। মুক্তিযোদ্ধাদের খাবারের সংকট দুরীকরণের লক্ষ্যে কম মূল্যে সরকারী বিভিন্ন বাহিনীর মত রেশন সুবিধা প্রদানও জরুরী। এতে তাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। তাদের জন্য সরকারী খরচে বিশেষ মডেলের পোশাক প্রদান করা প্রয়োজন। যাতে দেশের সকলেই তাদের সহজে চিহ্নিত করতে পারেন। প্রস্তাবিত এ সব সুবিধা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রদান করার কথা নুতন করে ভাবতে হবে। তা করতে পারলে তাদের ঋণ কিছুটা হলেও পরিশোধ হবে।
এবার আসা যাক মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই প্রসঙ্গে। এ প্রসঙ্গে আসার আগে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই যে, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ভীরে আসল মুক্তিযোদ্ধাগণ যেন হারিয়ে না যায় সে দিকে আমাদের খেয়াল রেখে কর্যকরী ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা নিরপন হয়নি। এটা অত্যন্ত দুঃখ জনক ঘটনা। এটা আমাদের এক ধরনের ব্যর্থতাও ধরে নেয়া যায়। আমরা আজো মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা প্রস্তত করতে পারিনি। নানা অবহেলা, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, দুর্নীতির কারণে অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সুযোগ সুবিধা নিচ্ছে। আবার প্রকৃত অনেক মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ পড়ার কারণে সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেনা। এটা হতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সঠিক হতে হবে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদেরই মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় স্থান পাওয়া উচিৎ। এ পর্যন্ত যতবার তালিকা প্রস্তত হয়েছে, সংশোধন হয়েছে, পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়েছে কোনটাই সঠিক না। মুক্তিযোদ্ধা তালিকার মধ্যে অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ঢুকে পড়ছে। আবার অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ পড়ে গেছে। এখনো অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছে যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে, মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেছে কিন্তু, আশ্চর্যজনক ভাবে এদের নাম তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হয়নি। যে সব পদ্ধতিতে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে সে পদ্ধতি সঠিক নয়।

যেমন মুক্তিবার্তায় নাম থাকলেই সে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাবে এমনটি না ভাবাই ভাল। মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করে নাই এমন অনেক লোকের নাম মুক্তিবার্তায় আছে। তাই বলে তারা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাবে ? মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার পরও অনেকের নাম মুক্তিবার্তায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এরা কি মুক্তিযোদ্ধা নন? সে সময় মুক্তিযোদ্ধারা অবহেলা, অজ্ঞানতা, উদাসীনতার কারনে কাগজ পত্রে নাম লেখাতে পারেনি। সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে পারেন নি। কেউ কেউ পারলেও তা আমলে নেননি। তাই বলে তাদের অবদান মুছে যাবে ? এটা হতে পারে না। কে আসল মুক্তিযোদ্ধা, কে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তা সঠিক ভাবে যাচাই বাছাই করলে এখনো তা চিহ্নিত করা যায়। সম্পুর্ন নিরপেক্ষ ভাবে সকল অনুরাগ-অনুকম্পা, রাগ-বিরাগ, দলীয় করণ, আত্মীয় করনের উর্ধেŸ উঠে স্থানীয় ভাবে স্বাক্ষ্য প্রমান সংগ্রহ করে এখনো আসল মুক্তিযোদ্ধা আর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করার সুযোগ রয়েছে। এটা খুব কঠিন কিছু না। এটা সম্পর্ন স্থানীয় ভাবে করা উচিৎ। জেলা, উপজেলা কিংবা সচিবালয়ে বসে দু’চার জনকে নোটিশ দিয়ে হাজির করে তাদের কথাবার্তা, মাতামত নিয়ে আসল নকল মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করা যাবে না। আসল ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করতে স্থানীয় পর্যায় আসতে হবে। আর এটা করা না গেলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন সম্ভব হবে না। সেটা সম্ভব না হলে মুক্তিযোদ্ধাদের ঋণ কোন দিন শোধ হবে না। শুধু কথায় না। কাজের মাধ্যমে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন করেত হবে। তার আগে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বাছাই করে বের করতে হবে। যারা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সেজে নানা সুবিধা নিচ্ছে তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। তাদের সকল প্রকার সুবিধা প্রদান বন্ধ করতে হবে। দেশে আর যাই হউক বা, না-ই হউক অন্তত মুক্তিযোদ্ধা তালিকা সঠিক ভাবে করার প্রয়োজন। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সততা ও দক্ষ্যতার সাথে কাজ করলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা তালিকা করা কঠিন কিছুনা। এটা করার উদ্যোগ নিতে হবে। আসল ও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করে তাদের সকল ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা প্রদান করতে পারলে আমাদের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অর্থবহ হবে।

লেখক: সাংবাদিক শহীদুল ইসলাম পাইলট, সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক রুদ্রবার্তা, শরীয়তপুর । কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ) ।

সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করুন
Share on FacebookShare on Google+Tweet about this on TwitterShare on LinkedInPrint this page

মন্তব্য

comments